ডেক্স রিপোর্ট::

মিতা এ বছর মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করেছে। তার রেজাল্ট ভালো। সে কলেজে ভর্তি হবে। কিন্তু তার গ্রাম থেকে কলেজ পাঁচ মাইল দূরে থানা সদরে। মিতার স্বপ্ন সে লেখাপড়া শেষ করে চাকরি করবে। কিন্তু এভাবে পাঁচ মাইল দূরের কলেজে গিয়ে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া তার জন্য বেশ কঠিন। তবে কি মিতার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে না? মিতা বা মিতার মতো যারা জীবনে এগিয়ে যেতে চায় তাদের জন্য সরকার থানা ও জেলা পর্যায়ে এবং বড় বড় শহরে নির্মাণ করেছে মহিলা হোস্টেল। সেখানে থেকে তাদের জন্য নিরাপদে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি রয়েছে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ।

দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। অর্ধেক এই জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে দেশের উন্নয়ন অসম্ভব। তাই বর্তমান সরকার নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। নারীর ক্ষমতায়ন বলতে আমরা বুঝি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যে কোনো বিষয়ে মত প্রকাশের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারা।

দেশেকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য নারীর ক্ষমতায়ন অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপট পুরুষশাসিত। নারীদের অগ্রগতির পথে আমাদের ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কিছু বাধা এখনও রয়েছে। গ্রামীণ নারীদের বেশিরভাগ সময় কাটে গৃহকর্মে। আর তাদের সেই গৃহকর্মের মূল্যায়ন করা হয় না। ক্ষেত্রেবিশেষে নারীকে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশে নিরুৎসাহিত করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে নারীর নিজস্ব আয়ের কর্তৃত্বও থাকে পুরুষের হাতে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ দেখা গেলেও সামগ্রিকভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কর্তৃত্বপরায়ণতার ক্ষেত্রে নারী এখনও পিছিয়ে আছে। আবার ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে ধর্মীয় অজুহাতে নারীকে ঘরের মধ্যে বন্দি রাখা হয় অনেক ক্ষেত্রে। তবে বর্তমান সরকারের বলিষ্ঠ পদক্ষেপের কারণে নারীও এখন আর পিছিয়ে নেই, এগিয়ে চলছে দেশের অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে। শিক্ষা আর দক্ষতা দিয়ে পুরুষের সঙ্গে সমানতালে এগিয়ে যাচ্ছে নারী।

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি উন্নয়নশীল অপার সম্ভাবনাময় দেশ। দক্ষিণ এশিয়ায় শুধু নয়, পৃথিবীর উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃত। বর্তমানে দেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ও সচিব নারী। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের সাম্প্রতিক মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন ‘শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়ন, লিঙ্গবৈষম্যসহ বিভিন্ন সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে আছে। এটি বাংলাদেশের জন্য অনেক বড় কৃতিত্ব। এসব বিষয়ে সবারই বাংলাদেশের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে।’

বর্তমান সরকারের অবিস্মরণীয় অর্জনের মূল কর্মসূচিগুলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্নপ্রসূত। তবে এসব কর্মসূচির মধ্যে বিশেষ কিছু কর্মসূচি আছে, যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একেবারেই নিজস্ব ধারণা ও পরিকল্পনায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। আশ্রয়ণ প্রকল্প, আমার বাড়ি আমার খামার প্রকল্প, ডিজিটাল বাংলাদেশ, নারীর ক্ষমতায়ন প্রভৃতি প্রকল্প প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিজস্ব এবং বিশেষ উদ্যোগের ফসল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এসব উদ্যোগ ‘শেখ হাসিনার বিশেষ উদ্যোগ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। বর্তমান সরকারের ভিশন হচ্ছে ২০২১ সালের মধ্যে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত মধ্যম আয়ের বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ উদ্যোগগুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবায়িত করা। এ প্রকল্পের ভিশন হচ্ছে, সব ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করে নারীর অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করা এবং মিশন হচ্ছে, পারিবারিক ও সামাজিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করা; শিক্ষা ও কর্মে নারীর অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করা; নারীর প্রতি বৈষম্য ও সহিংসতা প্রতিরোধ করা; নারীর সার্বিক মর্যাদা ও ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে আইন, বিধি প্রণয়ন ও প্রতিষ্ঠা স্থাপন করা।

আর এই মিশন বাস্তবায়নে দেশের প্রাইমারি স্কুলগুলোতে নারী শিক্ষকের হার বাড়ানোর জন্য সরকার ৬০ শতাংশ কোটা সংরক্ষণ করেছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও নারীর অংশগ্রহণের সুযোগ বেড়েছে। নারীর ক্ষমতায়নে সাফল্য বা অর্জনগুলো হলো নারীর ক্ষমতায়নে প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিগুলো বাংলাদেশের নারীদের সামাজিক অবস্থানকে অত্যন্ত সুদৃঢ় করেছে। দেশব্যাপী সাড়ে ১৩ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত গ্রামীণ শিশু ও নারীদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি, মা ও শিশুর যত্নসহ যাবতীয় বিষয়ে সেবা দেওয়া হচ্ছে। এ কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে ৩০ ধরনের ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। সুদমুক্ত ক্ষুদ্রঋণ প্রদান করা হচ্ছে। নারীর ক্ষমতায়ন ও নারী শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টিতে সরকার নারী পুনর্বাসন বোর্ড, জাতীয় মহিলা সালিশ কেন্দ্র, নিজেরা করি, মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি, আমরাও পারি, নারী প্রগতি সংঘ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বিভাগীয় শহর এমনকি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নির্মাণ করা হচ্ছে মহিলা হোস্টেল, গ্রহণ করা হয়েছে নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রকল্প, সৃষ্টি করা হয়েছে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ। গার্মেন্ট শিল্পে কর্মরত নারীর সংখ্যা ৪০ লাখে দাঁড়িয়েছে। নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা ঘোষণা করা হয়েছে। নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি চার মাস থেকে ছয় মাসে উন্নীত করা হয়েছে। সরকারি কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ৪০টি মন্ত্রণালয়ের জেন্ডার সেনসিটিভ বাজেট তৈরি করা হয়েছে। স্থানীয় সরকারের প্রতিটি স্তরেই সংরক্ষিত মহিলা আসনে সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বর্তমানে ১৭ হাজার ২৭৬ নির্বাচিত নারী জনপ্রতিনিধি রয়েছে। তারা দেশের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন।

প্রধানমন্ত্রীর এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সমাজসেবা অধিদপ্তর ও মাঠ প্রশাসন আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের সব জেলা ও উপজেলায় এ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। সংবিধানের ২৮(২)নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে পুরুষের সমান অধিকার লাভ করবে নারী’, যার সফল বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা প্রতিক্ষেত্রে চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ কর্তৃক গৃহীত হয়েছে নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য দূরীকরণের সনদ Convention on the Elimination of all forms of Discrimination Against Women (CEDAW)বাংলাদেশ এই সনদে স্বাক্ষর করেছে। ভিশন-২০২১ বাস্তবায়ন এবং ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। এ সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টার সফল বাস্তবায়নে আমাদের সবার সমন্বিত কার্যক্রম অত্যন্ত জরুরি। আরও জরুরি এ বিষয়ে মনিটরিং কার্যক্রম অব্যাহত রাখা। সবার সমন্বিত প্রচেষ্টা ও সহযোগিতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ উদ্যোগগুলোর সফল বাস্তবায়ন হবে।