ডেক্স রিপোর্ট::

গত ৪ জুন এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে বিজিএমইএর সভাপতি রুবানা হক চলতি জুন মাস থেকে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দেন। একই অনুষ্ঠানে তিনি সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ৩ জুন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ২৬৪ শ্রমিক। বিজিএমইএর সভাপতি আরও জানান, যত শ্রমিকের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা ছিল, ২৬৪ জন কিন্তু সেই তুলনায় খুবই কম। তার এমন বক্তব্যের মাধ্যমে একটা বিষয় সবার কাছে খুব স্পষ্ট হয়ে যায়, গার্মেন্ট মালিকরা ধরেই নিয়েছিলেন অনেক বেশি শ্রমিক করোনায় আক্রান্ত হবেন। অর্থাৎ তারা জেনেবুঝেই পোশাক কারখানা খুলে দিয়ে এসব হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিলেন। এটা খুবই অমানবিক মনে হলেও এ ধরনের নজির বাংলাদেশে এটাই প্রথম নয়। অতীতে স্পেকট্রাম বিল্ডিং ধস, তাজরীন ফ্যাশনে আগুন এবং ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধস প্রভৃতি দুর্ঘটনা প্রমাণ করে এদেশের হতদরিদ্র পোশাক শ্রমিকেরা বারবার গার্মেন্ট মালিকদের ব্যবসায়িক স্বার্থের বলি হয়েছেন।

বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির কারণে সম্ভাব্য সংকট সামাল দেওয়ার উদ্দেশ্যে সরকার পোশাক মালিকদের জন্য দুই শতাংশ সুদে পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করে। এ প্রণোদনা ঘোষণার মূল উদ্দেশ্য ছিল সব পোশাক শ্রমিকের জন্য অন্তত করোনাকালীন তিন মাসের মজুরি নিশ্চিত করা। আমি অর্থনীতির ছাত্র নই, তাই প্রণোদনার অর্থনৈতিক সঠিক পরিভাষা আমার জানা নেই। তবে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঘোষণার মাধ্যমে পরিষ্কার হয়েছে, প্রণোদনা বলতে বোঝানো হয়েছে, অত্যন্ত স্বল্প সুদে মালিকদের ধার দেওয়ার জন্য বরাদ্দকৃত টাকা, যা ধার নেওয়ার পরবর্তী দুই বছরের মধ্যে ফেরত দিতে হবে। এ ফেরত দেওয়ার বিষয়টা অনেক পোশাক কারখানার মালিকের পছন্দ হয়নি। তারা আসলে প্রণোদনার নামে সরকারের কাছে অফেরতযোগ্য অনুদান চেয়েছিলেন। সেটা না হওয়ায় তারা অনেকে হতাশ হয়েছেন। ২০০৯ সালে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দাকালে গার্মেন্ট মালিকেরা একবার পাঁচ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা পেয়েছিলেন, যা পরে ফেরত দিতে হয়নি। এমনটি এবারও হলে গার্মেন্ট মালিকরা বেশি খুশি হতেন। তাই আগামী আর্থিক বছরের বাজেট ঘোষণার আগে আরও কিছু সুবিধা বাগিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে ৪ জুন রুবানা হক এমন ঘোষণা দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করে।

আমাদের দেশে নিয়মিতভাবে শ্রমিক ছাঁটাই বা টার্মিনেশন হয়। কিন্তু এসব ছাঁটাই বা টার্মিনেশনের বিরুদ্ধে খুব বেশি কখনোই জোরালো প্রতিবাদ পরিলক্ষিত হয় না। পরিদর্শন অধিদপ্তরের হিসাবমতে বর্তমান করোনাকালে ১৭ হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন, যার ৯০ শতাংশ পোশাক শ্রমিক। এ মুহূর্ত আরও আট লাখ শ্রমিক চাকরি হারানোর শঙ্কার মধ্যে আছেন। অবস্থার উন্নতি না হলে এ সংখ্যা আরও বাড়বে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করে।

আমাদের দেশে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি শ্রমিক অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। তাদের বড় অংশ এখন তীব্র আর্থিক সংকটে আছে। এর সঙ্গে পোশাক শ্রমিকদের একটা বড় অংশ চাকরিচ্যুত হলে তা আমাদের বর্তমান সংকটময় অর্থনৈতিক ও আর্থসামাজিক ব্যবস্থার ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করবে, যা সরকারের জন্য কাম্য নয়। সে সুযোগটাই গার্মেন্ট ব্যবসায়ীরা নিতে চাচ্ছেন।

আমরা অতীতেও বারবার প্রত্যক্ষ করেছি, এদেশের গার্মেন্ট মালিকরা বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে দরকষাকষিতে বারবার ব্যর্থ হলেও সরকারের সঙ্গে দরকষাকষিতে যথেষ্ট পারঙ্গম। এখন দেখার বিষয় গার্মেন্ট মালিকরা এবারের বাজেটেও তাদের শ্রেণিস্বার্থে কী ধরনের সুবিধা আদায় করতে সক্ষম হয়।

আমাদের দেশে গত শতকের ষাটের দশক কিংবা সর্বশেষ আশির দশকে স্বৈরাচারী এরশাদ-বিরোধী যে তীব্র শ্রমিক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তা এখন সম্পূর্ণভাবে অনুপস্থিত। সে সময়ে শ্রমিক বলতে আমরা বুঝতাম, পাটকল, রেল, বিদ্যুৎ, বন্দরসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিক। এখন সে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে প্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদের বৃহত্তর অংশ পোশাক শ্রমিক এবং এর বাইরে ৮৫ থেকে ৮৭ শতাংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিক। এসব শ্রমিকের শ্রেণিস্বার্থ ও শ্রেণিচরিত্রেও ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। অন্যদিকে পোশাক শ্রমিকদের মধ্যে মূল ধারার শ্রমিক আন্দোলনের বাইরে আরেকটি ধারা পরিলক্ষিত হয়, যা মূলত বিদেশি অনুদাননির্ভর। এসব সংগঠনের প্রায় সব নেতা ও সংগঠক বেতনভুক কর্মচারী। এ ধারার অধিকাংশ সংগঠন গড়ে উঠেছে রানা প্লাজা ধসের পরে এবং এদের অনেক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে মালিকপক্ষের সঙ্গে অনৈতিক আঁতাতের কথাও প্রায়ই শোনা যায়। ফলে পোশাক খাতের শ্রমিকশ্রেণি সংগঠিত শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছে।

বিগত এপ্রিল ও মে মাসে যে কয়টি ত্রিপক্ষীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে, তাতে শ্রমিকশ্রেণির কোনো স্বার্থ রক্ষিত হয়নি। ফলে পোশাক শ্রমিকরা এপ্রিল মাসের ৬৫ শতাংশ মজুরি এবং ৫০ শতাংশ ঈদ বোনাস মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। মে মাসেও তার ব্যতিক্রম হবে না। সর্বশেষ রুবানার শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘোষণাও ত্রিপক্ষীয় সভার ফল বলে আমি মনে করি। কেননা ত্রিপক্ষীয় সভাতেই তো সিদ্ধান্ত হয়েছিল ঈদ পর্যন্ত কোনো শ্রমিক ছাঁটাই করা যাবে না, যার পরোক্ষ অর্থ দাঁড়ায় ঈদের পরে শ্রমিক ছাঁটাই করা যাবে। সুতরাং শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘোষণার দায় শুধু কি রুবানার? সেদিন ত্রিপক্ষীয় সভায় উপস্থিত শ্রমিক প্রতিনিধিরা কী বলবেন?

উপরোক্ত ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এদেশের মালিকরা তাদের শ্রেণিস্বার্থ রক্ষায় যথেষ্ট সুসংগঠিত হলেও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিরা বা শ্রমিক সংগঠনগুলো শ্রেণিস্বার্থ রক্ষায় বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। শ্রমিক আন্দোলনের দুটি স্তর থাকে। প্রথমত, লবি, অ্যাডভোকেসি ও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে রাষ্ট্র এবং মালিকপক্ষকে দাবির যৌক্তিকতা তুলে ধরা। এতে ফল না এলে রাজপথের সংগ্রামের মাধ্যমে দাবি আদায়ে বাধ্য করা। আলোচনার টেবিল ও রাজপথের সংগ্রামÑকোথাও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিরা সফলতা দেখাতে পারছেন না।

একদিকে শ্রমিকপক্ষের ব্যর্থতা, অন্যদিকে ধনিক শ্রেণি কর্তৃক শ্রমিক শোষণ নীতি আর রাষ্ট্রের ধনিক তোষণ নীতির কারণে শ্রমিকদের বঞ্চনার তালিকা ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে।

শ্রমিকের শ্রেণিস্বার্থ রক্ষায় নিবেদিত ও পরিক্ষিত শ্রমিক সংগঠনের নেতৃত্বে ব্যাপকভাবে শ্রমিককে সংগঠিত করে বিদ্যমান রাষ্ট্রকাঠামোর বিরুদ্ধে কার্যকর শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। দুর্নীতি, অন্যায্যতা ও শ্রেণিবৈষম্যমূলক এ সমাজ ভাঙতে হবে। তাহলেই কেবল শ্রমিকশ্রেণির মুক্তি সম্ভব।

সংগঠক, টিইউসি