Sharing is caring!

ডেস্ক রিপোর্ট এনকে বার্তা ২৪:

 

 

২০০০ সালে সৌদি সরকারের আর্থিক অনুদানে নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার ঘোষবাগ ইউনিয়নে প্রতিষ্ঠা করা হয় ২০শয্যা বিশিষ্ট আধুনিক ‘চর আলগী হাসপাতাল’। হাসপাতলটি প্রতিষ্ঠার পর ঘোষবাগের প্রায় ৩৬হাজার ও আশপাশের আরও ১৪-১৫হাজার লোকের চিকিৎসা সেবায় আধুনিকায়ন আসার সম্ভবনা থাকলেও গত ২০বছরেও তার কোন উন্নতি হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। জনগনের সেবা দেওয়াতো দূরের কথা উল্টো নানান সমস্যায় জর্জরিত হয়ে আছে হাসপাতালটি। নিয়মিত থাকেন না কোন চিকিৎসক বা সেবিকা। হাসপাতলটিতে রোগীদের জরুরি সেবার জন্য একটি এ্যম্বুলেন্স থাকলেও দেখা যায়নি সেটি। সম্পতি গাড়ীটি করোনার নমুনা পরিবহনের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানান দায়িত্বরতরা। কর্তৃপক্ষের দাবী জনবল, ওষুধ, পানি ও প্রয়োজনীয় মেশিনগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়া প্রতিনিয়ত ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসা সেবা।

 

হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, হাসপাতলটির ২০বেড খালি পড়ে আছে। এরমধ্যে বেশির ভাগ বেডই অনেক দিন ব্যবহার করা হয়নি। দুই তলা বিশিষ্ট হাসপাতালটির বেশির ভাগ কক্ষে ঝুলছে তালা। নিচতলার বহিঃবিভাগে একজন অফিস সহকারি, একজন ওয়ার্ডবয়, দ্বিতীয় তলায় একজন মেডিকেল অফিসার ও একজন সেবিকাকে দেখা যায়। কোন রোগী না থাকায় অলস সময় পার করছেন তারা। ২০ বেডের কোনটাতেই ভর্তি নেই কোন রোগী। দীর্ঘদিন পর্যন্ত ব্যবহার না থাকায় নষ্ট হয়েগেছে আল্ট্রাসনোগ্রাফি, এক্স-রে ও ইসিজি মেশিনসহ মূলবান আধুনিক যন্ত্রপাতি। এছাড়াও শীততাপ নিয়ন্ত্রিত অপারেশন থিয়েটার (ওটি) সকল মূল্যবান যন্ত্রপাতি পুরোপুরিভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। এ ওটি’টি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পর থেকে একবারও ব্যবহার করা হয়নি বলে জানিয়েছেন কর্মরত কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।

 

হাসপাতালের বাহিরে দেখা যায়, হাসপাতালের সিঁড়িতে পড়ে আছে কর্তব্যরত চিকিৎসকের লেখা কয়েকটি ওষুধের স্লিপ। স্থানীয়রা বলছেন হাসপাতাল থেকে ওষুধ না দেওয়ায় রোগীরা স্লিপগুলো ফেলে দিয়ে গেছে। বড় রোগের চিকিৎসাতো দূরের কথা ছোট-খাট কোন রোগের চিকিৎসা করতে আসলেও তাদের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণ ওষুধ পাওয়া যায় না। স্থানীয় পল্লী চিকিৎসকদের সাতে হাসপাতালটির কর্মচারীদের যোগসাজ থাকারও অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে সম্পর্কে অবগত আছেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন বলে জানিয়েছেন সিভিল সার্জন।

 

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০০০ সালে একজন আরএমও, পাঁচজন মেডিকেল অফিসার, ছয়জন সেবিকা ও চারজন ওয়ার্ডবয়সহ ৩২জন কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়ে যাত্রা শুরু করে হাসপাতালটি। যার মধ্যে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ১৫জন। আর চিকিৎসা সেবায় একজন আবাসিক মেডিকেল অফিসার, একজন মেডিকেল অফিসার, একজন সেবিকা বর্তমানে হাসপাতালে আছেন। এদের মধ্যে জরুরি সেবায় আছেন মাত্র একজন মেডিকেল অফিসার ও একজন সেবিকা।

 

প্রতিদিন হাসপাতালের বহিঃবিভাগে ছোট খাট সমস্য নিয়ে রোগিরা আসে। তাদের মধ্যে বেশির ভাগই প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে চলে যায়। আবার বড় ধরনের কোন সমস্যা হলে রোগীরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা জেলা সদর হাসপাতালে চলে যায়। অজ্ঞাত কারনে এ হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নিয়ে স্থানীয় লোকজনের আগ্রহ নেই বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

 

হাসপাতালের রেজিস্ট্রারে দেখা যায়, গত মার্চ মাসের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আবাসিক ও বহিঃবিভাগে ১১৭২জন রোগী আসেন। যার মধ্যে বিভিন্ন মেয়াদে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন ৩২জন রোগী। সবশেষ গত ৪এপ্রিল একজন রোগি ভর্তি হওয়ার পর ৮এপ্রিল ছাড়পত্র নিয়ে চলে গেছেন।

 

স্থানীয় একজন ব্যবসায়ী অভিযোগ করে বলেন, গত কয়েক মাস আগে তার তিন বছরের শিশু বাচ্চাকে পেটে সমস্য নিয়ে চর আলগী হাসপাতালে নিয়ে আসেন। কর্মরত চিকিৎসককে দেখানোর পর তিনি দেখে কোন ওষুধ না দিয়ে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যেতে পরমার্শ দেন। ব্যবসায়ীর অভিযোগ তার বাচ্চাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে বললে ওই চিকিৎসক জানান পাঁচ বছরের কম বয়সী কোন রোগীতে এ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় না। একই অভিযোগ করেন স্থানীয় এক ব্যক্তি। দীর্ঘ ৮বছর ধরে পেটের ব্যাথায় ভুগছিলেন তার স্ত্রী। বাড়ীর পাশ্ববর্তী হাসপাতাল হওয়ায় এখানে নিয়ে আসেন তাকে। কিন্তু চিকিৎসকের কাছ থেকে কোন সহযোগিতা না পেয়ে চট্টগ্রাম নিয়ে যান নিজের স্ত্রীকে। বর্তমানে চট্টগ্রামে তার চিকিৎসা চলছে।

 

স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করে বলেন, হাসপাতালটি নামেই শুধু। এখানে থাকেনা কোন চিকিৎসক, দেওয়া হয়না কোন চিকিৎসা সেবা। কোন রোগী নিয়ে হাসপাতালে আসলে তারা না দেখে বসুরহাট, কবিরহাট ও মাইজদীতে নিয়ে যেতে বলে। হাসপাতালটিতে চিকিৎসক নিয়োগ কাগজে কলমে থাকলেও তারা নিয়মিত আসেন না। কয়েকজন মাঝে মাঝে আসলেও হাসপাতালে ১-২ঘন্টার বেশি থাকেন না। আরএমও বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আসেন আবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে চলে যান। হাসপাতালটিতে পুর্ণাঙ্গ চিকিৎসা সেবা চালু করতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয়রা।

 

হাসপাতালে কর্তব্যরত মেডিকেল অফিসার ডা. মহিবুল আলম জনবল সমস্যার কথা স্বীকার করে বলেন, জনবল ছাড়াও পানি সংকট, চিকিৎসার কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতিগুলো নষ্ট, বিদ্যুৎ সমস্যা, জেনারেটর মেশিন নষ্ট হয়ে যাওয়ায় চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে। তারপরও শুরু থেকে চিকিৎসা সেবা উন্নতি করার জন্য আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। প্রতিদিন গড়ে ৭০-৮০জন রোগীকে আমরা চিকিৎসা সেবা দিচ্ছি। যার মধ্যে ৫-৬জন হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন।

 

তিনি আরও বলেন, জরুরি রোগী যারা আসছেন আমরা তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে নিকটস্থ উপজেলা হাসপাতালে স্থানান্তর করছি। আমাদের পর্যাপ্ত পরিমান যন্ত্রপাতি থাকলে হইতো তার করা লাগতো না। বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

 

জেলা সিভিল সার্জন ডা. মাসুম ইফতেখার জানান, হাসপাতালটির বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে ইতোমধ্যে আমরা অবগত হয়েছি। জনবল সংকটের বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে ওষুধের সমস্যটি সমাধান করা হবে। অতিদ্রুত হাসপাতালটির জন্য ইসিজি মেশিনের ব্যবস্থা করা হবে। পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় সকল যন্ত্রপাতি হাসপাতালটিতে পুনঃস্থাপন করে জনগনের শতবাগ সেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য বিভাগ কাজ করছে।

 

এক প্রশ্নের জবাবে এ কর্মকর্তা বলেন, বাহিরের ওষুধ ব্যবসায়ী বা পল্লী চিকিৎসকদের সাথে হাসপাতালের কোন কর্মকর্তা কর্মচারীর যোগসাজ থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

 

-ই/পি/এম/এস

Sharing is caring!