ঈদযাত্রার ১৫ দিনে দেশের সড়ক, রেল ও নৌপথে ৩৭৭টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন ৩৯৪ জন। আর আহত হয়েছেন ১ হাজার ২৮৮ জন। এর মধ্যে শুধু সড়কেই ৩৪৬টি দুর্ঘটনায় ৩৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ১ হাজার ৪৬ জন।
সোমবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর-রুনী মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে ঈদুল ফিতরে সারাদেশে সংগঠিত দুর্ঘটনার প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি এসব তথ্য জানায়। বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবর পর্যালোচনা করে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে সমিতির সড়ক দুর্ঘটনা মনিটরিং সেল।
সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনের তথ্য উপস্থাপন করেন যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী। উপস্থিত ছিলেন সমিতির যুগ্ম মহাসচিব আলমগীর কবীর, মঞ্জুর আহমেদ ঈছা প্রমুখ।
মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, বাস মালিক সমিতি ও শ্রমিক ফেডারেশনের প্রভাব, ভাড়া নৈরাজ্য এবং দুর্বল মনিটরিং ব্যবস্থা দুর্ঘটনা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। পুরনো আমলা, আগের মাফিয়া নেতাদের অনুসারী বাস মালিক সমিতি এবং শ্রমিক ফেডারেশনের বর্তমান সরকারসর্মথিত নেতাদের চাপে এবারও সড়ক সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলো ঈদব্যবস্থাপনা সভায় যাত্রীদের পক্ষে কথা বলার মতো নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি রাখা হয়নি। ফলে সড়কখাতে বিশৃঙ্খলা বেড়েছে।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদনে বলা হয়, চলমান ইরান-ইসরায়েলুযুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে গত ১৫ দিনে হতাহত বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা অনেক বেশি।
এতে বলা হয়, ঈদ উপলক্ষে যাত্রা শুরুর দিন ১৪ মার্চ থেকে ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফেরার দিন ২৮ মার্চ পর্যন্ত ১৫ দিনে ৩৪৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৫১ জন নিহত ও ১ হাজার ৪৬ জন আহত হয়েছেন। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ২ হাজার ১৭৮ জন জাতীয় অর্থোপেডিক (পঙ্গু) হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ২০২৫ সালের ঈদুল ফিতরে ৩১৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩২২ জন নিহত ও ৮২৬ জন আহত হন। বিগত বছরের সঙ্গে তুলনা করলে এবারের ঈদে সড়ক দুর্ঘটনা ৮ দমশিক ৯৫ শতাংশ, প্রাণহানি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ ও আহত ২১ শতাংশ বেড়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, একই সময়ে রেলপথে ২৩টি দুর্ঘটনায় ৩৫ জন নিহত ও ২২৩ জন আহত হয়েছেন। নৌপথে ৮টি দুর্ঘটনায় ৮ জন নিহত, ১৯ জন আহত ও ৩ জন নিখোঁজ রয়েছেন। সব মিলিয়ে সড়ক, রেল ও নৌপথে ৩৭৭টি দুর্ঘটনায় ৩৯৪ জন নিহত এবং ১ হাজার ২৮৮ জন আহত হয়েছেন।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত কয়েক বছরের মতো এবারও দুর্ঘটনার শীর্ষে রয়েছে মোটরসাইকেল। এবারের ঈদে ১২৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৩৫ জন নিহত, ১১৪ জন আহত হয়েছেন, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩৬ দশমিক ১২ শতাংশ, নিহতের ৩৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ এবং আহতের ১০ দশমিক ৮৯ শতাংশ প্রায়।
এতে বলা হয়, দুর্ঘটনার শিকার মোট যানবাহনের ২৭ দশমিক ১৬ শতাংশ মোটরসাইকেল, ১৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান, ১৬ দশমিক ২২ শতাংশ বাস, ১৫ দশমিক ২৮ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা, ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ প্রাইভেট কার-মাইক্রোবাস, ৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ নছিমন-করিমন এবং ৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ সিএনজিচালিত অটোরিকশা এসব দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল।
বিশ্লেষণ বলছে, ৪৩ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ৩০ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে, ২২ শতাংশ ফিডার রোডে সংঘটিত হয়। দুর্ঘটনার ধরনে মুখোমুখি সংঘর্ষ ৩৫ দশমিক ৮৩ শতাংশ, পথচারীকে চাপা দেওয়া ৩২ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়া ২২ দশমিক ২৫ শতাংশ ঘটনা সবচেয়ে বেশি। এছাড়া দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে চালক, পথচারী, শিশু, নারী, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের উপস্থিতি রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ১৩ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে, সড়কে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো ও ভাড়া আদায়ে স্মার্ট পদ্ধতি চালু; মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত রিক্সা আমদানী ও নিবন্ধন বন্ধ করা; জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে রাতের বেলায় অবাধে চলাচলে আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা; দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ ও যানবাহনের ডিজিটাল পদ্ধতিতে ফিটনেস প্রদান; বিআরটিএ অনুমোদিত ড্রাইভিং স্কুলের সরকার ঘোষিত ৬০ ঘন্টা ইনক্লুসিভ ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ ছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান বন্ধ করা এবং পরিবহন সেক্টরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও মালিক সমিতির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বন্ধ করা।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির সুপারিশে আরও আছে, গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাসড়কে সার্ভিস লেইনের ব্যবস্থা করা; সড়কে চাদাঁবাজি বন্ধ করা, চালকদের বেতন ও কর্মঘন্টা সুনিশ্চিত করা; মহাসড়কে ফুটপাত ও পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা রাখা, রোড সাইন ও রোড মার্কিং স্থাপন করা; উন্নতমানের আধুনিক বাস নেটওয়াক গড়ে তোলা, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএর সক্ষমতা বৃদ্ধি; মানসম্মত সড়ক নির্মাণ ও মেরামত সুনিশ্চিত করা, নিয়মিত রোড সেইফটি অডিট করা; সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইউনিট চালু এবং স্বল্পমেয়াদী, মধ্যমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী নানা পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি ঢাকার ওপর জনসংখ্যার চাপ কমানো।
প্রকাশক ও সম্পাদক: মোহাম্মদ সেলিম , ঢাকা অফিস : সিটিহার্ট, সুইট নং ১৫/২, ৬৭ নয়াপল্টন, ঢাকা-১০০০। ই-মেইল:: nkbarta24@gmail.com
Copyright © 2026 Nk Barta 24. All rights reserved.