Sharing is caring!

পোশাক কারখানায় শ্রমিকরা। ছবি: ফাইল।
সারাদেশে সীমিত আকারে পোশাক কারখানাগুলো খোলা হয়েছে। অন্তত চার শতাধিক কারখানায় উৎপাদন শুরু করেছেন মালিকরা। তবে প্রথমদিনে রোববার কারখানায়ও পুরোদমে কাজ চলেনি। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে কারখানার ভেতরের যন্ত্রপাতি স্থাপন ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন করা হয়েছে। এর মধ্যে খানিকটা ঝুঁকি নিয়েই গড়ে ৩০ শতাংশ শ্রমিক শুরুর দিনে উৎপাদন কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছে।

কারখানা মালিকরা জানাচ্ছেন, যেসব শ্রমিক কাজে যুক্ত হয়েছেন তারা খুলে দেয়া কারখানাগুলোর আশেপাশে বসবাস করেন। তবে বন্ধ থাকা অনেক কারখানার শ্রমিকও গণপরিবহন বন্ধ থাকার মধ্যে সারাদেশ থেকে শিল্পাঞ্চলে ফিরেছেন। তবে এই মুহূর্তে ঢাকার বাইরের শ্রমিকদের কারখানায় না আনার জন্য কঠোরভাবে নির্দেশনা দিয়েছে বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ।

বিজিএমইএ সূত্রমতে, সীমিত পরিসরে কারখানা খোলা রাখার সুযোগ চেয়ে ৮৫৮টি কারখানা কর্তৃপক্ষ থেকে সংগঠনের কাছে আবেদন আসে। তবে রপ্তানি আদেশ বাতিলের সাধারণ ঘটনার পর কোনো কারখানায় এই মুহূর্তে কি ধরনের কাজ রয়েছে- সে বিষয়ে একটি জরিপ চালিয়েছে বিজিএইএ। গত কয়েক দিন ধরে পরিচালিত ৯০ পৃষ্ঠার এই জরিপের ফলের ভিত্তিতে জরুরি কাজের কারখানাগুলোকে খুলে দেয়ার জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে খোলার অনুমতি পাওয়া কারখানার সংখ্যা ৪০০। ঢাকা মেট্রো এলাকা এবং নারায়ণগঞ্জের তুলনামূলক বড় কারখানাগুলোকে এক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।

রোববার (২৬ এপ্রিল) সকাল থেকেই মাস্ক, হাত মোজা বা গ্লাভস পরে কারখানায় ঢুকতে দেয়া হয়েছে শ্রমিকদের। প্রবেশ মুখে শ্রমিকদের শরীরের তাপমাত্রা মাপা হয়। হাত ধোয়ার পর্যাপ্ত উপকরণও ছিল। সব মিলিয়ে কোনো ধরনের সমস্যা ছাড়াই প্রথমদিনের উৎপাদন কার্যক্রম চলেছে। কারখানা খোলার শর্ত হিসেবে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করে বিজিএমইএ একটি গাইডলাইন করে সদস্য কারখানাগুলোতে পাঠিয়েছে।

এতে বলা হয়, কারখানায় প্রবেশের আগে শ্রমিকদদের শরীরের তাপমাত্রা মেপে দেখতে ব্যবস্থা করতে হবে। কারখানা ভবনের বাইরে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। শ্রমিক কর্মচারীসহ কারখানায় প্রবেশের ক্ষেত্রে সকলের জুতায় জীবাণুনাশক স্প্রে করতে হবে। এছাড়া কারখানায় প্রবেশের আগে জুতাগুলো যেন পলিব্যাগে রেখে একটি নির্দিষ্ট স্থানে (সুর‌্যাক) রাখতে হবে। এসব স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে কিনা তা তদারকি করতে মনিটরিং টিম গঠন করেছে বিজিএমইএ। তবে রপ্তানি আদেশের কাজ না থাকা কিংবা কম থাকা কারখানাগুলো সরকারি সাধারণ ছুটির সঙ্গে মিল রেখে আগামী ৫ মে পর্যন্ত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

এদিকে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় মার্চ মাসের বেতনের দাবিতে শ্রমিকরা রাস্তা অবরোধও করে। এর প্রেক্ষিতে রোববার শ্রম প্রতিমন্ত্রীর বাসায় জরুরি বৈঠক করেন পোশাক খাতের শীর্ষ স্থানীয় নেতারা। আর কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই) বলছে, আন্তর্জাতিক মান পর্যালোচনা করে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে গাইডলাইন দেবে অধিদপ্তর। সে অনুযায়ী কারখানা চালাতে হবে।

অন্যদিকে, সারাদেশে প্রথমদিনে কত কারখানা খোলা হয়েছে, তার সঠিক তথ্য বিজিএমইএ জানায়নি। তবে শিল্প পুলিশের তথ্য মতে, সারাদেশে প্রথম দিনে ১৪২৭টি কারখানা চালু হয়েছে। সীমিত পরিসরে রোববার থেকে কারখানা খোলার বিষয়টি অবহিত করে ২৫ এপ্রিল বিজিএমইএ শ্রম সচিবকে একটি চিঠি দেয়।

ওই চিঠিতে বলা হয়, বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশ ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক কার্যক্রম চালু করেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সংগঠনের সদস্যভুক্ত কারখানাগুলো পর্যায়ক্রমে খোলা হচ্ছে। শুরুতে রোববার ও সোমবার ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের কিছু কারখানা; ২৮ থেকে ৩০ এপ্রিল আশুলিয়া, সাভার, ধামরাই ও মানিকগঞ্জের কারখানা; ৩০ এপ্রিল রূপগঞ্জ, নরসিংদী, কাঁচপুর এলাকা; ২ ও ৩ মে গাজীপুর ও ময়মনসিংহ এলাকার কারখানা চালু করা হবে। কারখানা খোলার ক্ষেত্রে শুরুতে উৎপাদনক্ষমতার ৩০ শতাংশ চালু করা হবে। পর্যায়ক্রমে তা বাড়ানো হবে।

এ বিষয়ে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) মহাপরিদর্শক শিবনাথ রায় বলেন, শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আগে অধিদপ্তর থেকে কিছু নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। সে অনুযায়ী বিজিএমইএ গাইডলাইন করে কারখানা চালু করেছে। কারখানা খোলার ক্ষেত্রে গাইডলাইন অনুসরণ করা না হলে আরসিসির (রেমিডিয়েশন কো-অর্ডিনেশন সেল) বিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে বিজিএমইএকে বলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মান পর্যালোচনা করে এক সপ্তাহের মধ্যে অধিদপ্তর থেকে কারখানা চালুর বিষয়ে একটি গাইড লাইন দেয়া হবে। গার্মেন্ট মালিকদের তা অবশ্যই অনুসরণ করে কারখানা খুলতে হবে।

বিকেএমইএ’র জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বিকেএমইএ এলাকা ভাগ করে কারখানার খোলার নির্দেশনা দেয়নি। রোববার গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে কারখানা খোলা হয়েছে। এগুলোতে নিটিং, ডাইং ও স্যাম্পলের কাজ হয়েছে। তিনি আরো বলেন, যাদের অর্ডার আছে তাদের শ্রমিকদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে কারখানা খুলতে বলা হয়েছে।

তবে কারখানা খোলার বিপক্ষে মত দিয়েছেন বাংলাদেশ গার্মেন্ট বায়িং হাউজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কাজী ইফতেখার হোসেন। তিনি বলেন, মালিকদের পাশাপাশি করোনা বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে কারখানা চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন ছিল। আমরা যারা কারখানার মালিক আমরা এ সম্পর্কে কি বুঝি? তাই শ্রমিকদের কথা চিন্তা করে আরও কয়েকদিন অপেক্ষা করাই ছিলো ভালো। আগে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা দেয়া প্রয়োজন। কাজী ইফতেখার হোসেন আরো বলেন, সামনে ঈদের ছুটি হবে, তখন শ্রমিকরা আবার গ্রামে ছুটবে। এতে করে পুরো দেশ সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়বে।

এদিকে জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারি লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম রনি অভিযোগ করে বলেন, শ্রম মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও মালিকদের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। যে যার মতো করে কাজ করে। যখন ইচ্ছা শ্রমিকদের ডাকে, যখন ইচ্ছা পাঠিয়ে দেয়। তিনি বলেন, কারখানা খোলার বিষয়ে এ পর্যন্ত শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে কোনো ধরণের আলোচনা করা হয়নি।

Sharing is caring!