চিকিৎসক-টেকনিশিয়ান-জনবল সংকটে ধুঁকছে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
- আপডেট সময় : ০৯:৪৪:১৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে

দেশের দক্ষিণ প্রতিমাঞ্চল সীমান্তঘেষা জনপদ সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার প্রায় ৩ লক্ষ মানুষের চিকিৎসা সেবার একমাত্র ভরসা স্থল কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ১৯৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ২০ শয্যার হাসপাতালটি ২০১০ সালের ২৪ ডিসেম্বর এটি ৫০ শয্যার হাসপাতাল হিসাবে উন্নীত হলেও বাস্তব চিত্র পুরোপুরি উল্টো। চিকিৎসকের ৩৪ টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ছাড়া কর্মরত আছেন মাত্র ৫ জন চিকিৎসক। যার ফলে বহির্বিভাগ ও জরুরী বিভাগে আসা রোগীদের চাপ সামলাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছেন। শনিবার (২৪ অক্টোবর) বেলা ১০ টার দিকে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় হাসপাতালের বহির্বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডাঃ রিপন বিশ্বাস এবং জরুরী বিভাগে ১ জন মহিলা উপস্বাস্থ্য সহকারী ছাড়া আর কোন ডাক্তার নাই। ঐ সময় শত শত নারী পুরুষের দীর্ঘ সারিবদ্ধ লাইন সামলাতে কর্তব্যরত আনসার সদস্যদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। বর্তমানে কালিগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা হলো ডাঃ সুজায়েত হোসেন, ডাঃ সাইদুর রহমান, ডাঃ হাবিবুর রহমান (আর,এম ও) ডাঃ সাইফুল ইসলাম ।
একইভাবে ৩৬ জন সেবিকার পদে আছেন মাত্র ২০ জন এবং মাতৃ স্বাস্থ্য নিরাপদ প্রসবের জন্য আছে গুরুত্বপূর্ণ ১০ টি মিড ওয়াইফ পদের বিপরীতে ৫ জন মিড ওয়াইফ পদ শূন্য পড়ে আছে। বাকি নার্সিং সুপারভাইজার ও সিনিয়র স্টাফ নার্স ২৬ টি পদে সুপারভাইজার সহ ১৭ টি পদ শূন্য পড়ে আছে। বাকি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে প্রথম শ্রেণীর ৪ ইউনিয়ন পর্যায় সহকারী সার্জন ৮ জনসহ ১২ টি পদে কোন ডাক্তার নাই। এরমধ্যে তৃতীয় শ্রেণীর ১৪২ জনের মধ্যে ৬৮ জন কর্মচারী কর্মরত আছে বাকি ৩৪ টি পদ শূন্য। চতুর্থ শ্রেণীর ২৩ জন কর্মচারীর মধ্যে ১২ জন থাকায় ১১ পদ খালি আছে। আউটসোর্সিংয়ে ১১ টি পদের বিপরীতে ১৮ জনের পরিবর্তে ১ জন আয়া, ১ জন কুক, ১ জন পরিচ্ছন্ন কর্মী সহ ৩ জন ছাড়া বাকি ১৫ টি পদ শূন্য ।
হাসপাতালটির অন্যতম বড় বিড়ম্বনা হলো অত্যাধুনিক অপারেশন থিয়েটার (ওটি) থাকলেও গাইনি বা কোন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার না থাকায় কোটি টাকা মূল্যের যন্ত্রাংশ জিনিসপত্র নষ্ট হচ্ছে। একইভাবে সার্জারি টেকনিশিয়ান না থাকায় এক্সরে রুমে তালাবদ্ধ, আল্ট্রাসোনো রুম বন্ধ, এখানে কোটি টাকার আধুনিক ওটি সুবিধা থাকলেও শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও টেকনিশিয়ান না থাকায় অপারেশন থিয়েটার (ওটি) পুরোপুরি বন্ধ হয়ে রয়েছে। গাইনোকোলজি ও সার্জারির মতো গুরুত্বপূর্ণ কনসালট্যান্ট পদ শূন্য থাকায় গর্ভবতী মা ও রোগীদের সিজারিয়ান সেকশন কিম্বা যে কোনো জরুরি অস্ত্রোপচার সম্পূর্ণ বন্ধ। ফলে বাধ্য হয়ে প্রসূতি মা ও মুমূর্ষ রোগীদের ৩৫/৪০ মাইল দূরে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল ও সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করে দায় সারা হচ্ছে। অন্যদিকে জরুরি মুহূর্তে ঝুঁকিতে পড়ছে প্রসূতি ও নবজাতকের জীবন। ফলে বাধ্য হয়ে আশেপাশের কোন বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিকে মোটা অংকের টাকা গর্চা দিতে হচ্ছে সেবা প্রত্যাশীদের।
চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি রোগ নির্ণয়ের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও লোক বলের অভাব পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। হাসপাতালে একটি আলট্রাসোনা গ্রাম করার সোনোলজিস্ট পদ শূন্য, ইসিজি টেকনিশিয়ান নেই, এক্সরে টেকনিশিয়ান পদ ফাঁকা । লোক বল ও ব্যবহারের অভাবে কোটি টাকার আল্ট্রাসনোগ্রাম, ইসিজি ও এক্সরে মেশিন ও ওটির মূল্যবান সরঞ্জামাদি বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে থেকে ধুলাবালিতে ও মরচে ধরে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। দন্ত বিভাগে অনুরূপ যন্ত্রপাতি থাকলেও ডাক্তার, টেকনিশিয়ান নাই। চোখের ডাক্তার না থাকলেও কোটি টাকার যন্ত্রপাতি লাগালেও শুধুমাত্র অনলাইনের মাধ্যমে যশোর হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে। চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ মোসাদ্দেক হোসেনকে দীর্ঘ ৬ মাস আগে বদলি করলেও তিনি এখনো কালিগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগদান করেননি। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ডাঃ ডালিয়া আক্তার গত ১২ অক্টোবর বদলি হলে তার জায়গায় ডাঃ নাসির উদ্দিনকে বদলি করলেও তিনি মফস্বলের উপজেলা বলে যোগদান না করায় বর্তমানে আবাসিক মেডিকেল অফিসারের পদটি শূন্য থাকায় বর্তমানে আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডাঃ হাবিবুর রহমান অতিরিক্ত উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করে আসছে। অন্যদিকে মেডিকেল অফিসার ডাঃ রুপা রানী পাল মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকায় চিকিৎসা সেবা আরো সংকটে পড়েছে।
বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা আলপনা গোস্বামী, সকিনা খাতুন ,মনিরা বেগম, হালিমা খাতুন, মনোয়ারা খাতুন এ প্রতিনিধিকে জানান ডাক্তার না থাকায় একজন ডাক্তারের কাছে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে আকাঙ্খিত সেবা মিলছে না। শুধুমাত্র প্যারাসিটামল, গ্যাসের ওষুধ ,এলার্জির ট্যাবলেট ভিটামিন ট্যাবলেট নিয়ে চলে যেতে হচ্ছে। বাকি ওষুধ বাইরে থেকে কিনে খেতে হবে। এ ব্যাপারে হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ও অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ডাঃ হাবিবুর রহমানের নিকট জানতে চাইলে তিনি জানান চিকিৎসক ও জনবল সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও কোন সূরাহ মিলছে না। সাতক্ষীরা জেলা সিভিল সার্জন ডাঃ আব্দুস সালামের নিকট জানতে চাইলে তিনি এ প্রতিনিধিকে জানান চিকিৎসক ও জনবল সংকটের বিষয় নিয়ে একাধিকবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিত ভাবে জানানো হলেও এর কোন সমাধান মেলেনি। নতুনভাবে যদি কোন ডাক্তার দেয় তাহলে কিছুটা সমস্যার সমাধান হবে। নতুন উপজেলা স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তার যোগদানের বিষয়টি তিনি স্বীকার করে জানান যোগদান না করলে আমার কিছু করার নাই। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্য মন্ত্রীর আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছে সচেতন মহল সহ উপজেলা বাসি।




















