Sharing is caring!

প্রতিবেদকঃ

বৃহত্তর নোয়াখালীর প্রধান বানিজ্যিক কেন্দ্র বেগমগঞ্জ উপজেলার চৌমুহনী এখন জেলার করোনা ভাইরাস সংক্রমন ছড়ানোর মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিনত হয়েছে। বেগমগঞ্জে আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি সেখান থেকে জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও প্রতিবেশি জেলা ফেনী ও লক্ষ্মীপুরের বিভিন্ন উপজেলায় সংক্রমন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত ৩-৪ দিনে চাটখিল, সোনাইমুড়ী সেনবাগসহ বিভিন্ন উপজেলায় সংক্রমিত ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছেন যারা সম্প্রতি বেগমগঞ্জের চৌমুহনী শহর, কলেজ রোড ও গোলাবাড়িয়া এলাকায় গিয়ে ছিলেন। বর্তমানে বেগমগঞ্জে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৫১ জন।

মাঝারী ও ছোটখাটো শিল্প কারখানা এবং পাইকারি বাজার হিসেবে চৌমুহনীর খ্যাতি বৃহত্তর নোয়াখালী জুড়ে। এ শহরে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার মানুষ বসবাস করে। লকডাউনের মধ্যে প্রতিদিন শতশত মানুষ জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে চৌমুহনীতে অবাধে যাতায়াত করেন। পাইকারী দোকান গুলোতে বেচাকেনা ও খাদ্য সামগ্রী চাল, আটা, লবন, পেয়াজসহ বিভিন্ন পন্য বহনকারী যানবাহন কাভার্ড ভ্যান, বড় ট্রাক, মিটি ট্রাক বিভিন্ন প্রকার যান বাহন সকাল-সন্ধ্যা চলাচল করেই চলছে। এসকল পরিবহনের মালামাল লোড আনলোড কাজে এবং ক্রয় বিক্রয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট লোকজন অবাধে চলাফেরা করে থাকেন। এদের মধ্যে ৯০ শতাংশ লোক মাস্ক ব্যবহার করেন না। এই চলাচল প্রতিরোধে স্থানীয় প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে বলে স্থানীয় সুশীল সমাজের লোক জনের মন্তব্য। এছাড়াও লকডাউনের মধ্যেই চৌমুহনী শহর থেকে শত শত মানুষ জেলার ৯টি উপজেলায় ও ফেনী-লক্ষ্মীপুর-কুমিল্লা জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের অনেকেই বিভিন্ন উপজেলায় করোনায় আক্রান্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন।

কুমিল্লার লাকসামে করোনা শনাক্ত হওয়া দুই যুবক চৌমুহনী বাজারের একটি আড়তে চাকরী করতেন। তারা আক্রান্ত হওয়ার আগে ওই আড়তের আরও এক কর্মচারী (২৮) করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে আড়তের মালিক গগন সাহা তথ্য গোপন করে তড়িগড়ি করে রাতের আধারে মরদেহ জেলা সদরের সোনাপুর মহা শশ্মানে দাহ করে। এ ঘটনার পর ওই আড়তের মালিক গগন সাহা ও তার পরিবার ও করোনায় আক্রান্ত হন। এঘটনার পর স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন গগন সাহার চৌমুহনী বাজারের দুটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান লকডাউন করে পরিবারের কর্মচারীদের হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠায়। কিন্তু তিনি লকডাউন অমান্য করে গত সোমবার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে দেন। খবর পেয়ে বেগমগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: মাহাবুব আলম ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে ১ লাখ টাকা জরিমানা করে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেন।

চাটখিল উপজেলার খিলপাড়া ইউনিয়নের দেলিয়াই মাদ্রাসার এক শিক্ষক সম্প্রতি বেগমগঞ্জে তার এক স্বজনের বাড়িতে যান। সেখান থেকে আসার পর তার করোনার উপসর্গ দেখা দেয়। নমুনা পরীক্ষার ফলাফলে ওই শিক্ষক ও তার ৯ বছর বয়সী ছেলের করোনা পজেটিভ আসে। সোনাইমুড়ী উপজেলার পতিশ গ্রামের বাসিন্দা এক যুবক (৩২) বেগমগঞ্জের মিরওয়ারিশপুর ও চৌমুহনী বাজারে ভ্রাম্যমান ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি করোনায় আক্রান্ত হয়ে গত ৭ মে মারা বেগমগঞ্জে মারা যান। এছাড়া বিভিন্ন উপজেলায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের অনেকে বেগমগঞ্জ ও চৌমুহনীতে যাতায়াত করেছে বলে মন্তব্য উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: অসীম কুমার দাসের।

বেগমগঞ্জ মডেল থানার ওসি হারুনুর রশিদ চৌধুরী বলেন, চৌমুহনী পাইকারি বাজার বন্ধ করা যাচ্ছে না। এখানে জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে ব্যবসায়ীরা পন্য সামগ্রী ক্রয় করতে আসেন। এদের মাধ্যমে করোনা দ্রুত বিভিন্ন উপজেলায় ছড়িয়ে পড়ছে।

বেগমগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: অসীম কুমার দাস বেগমগঞ্জ উপজেলাকে হটস্পট উল্লেখ করে বলেন, এখানে যে ৬ জন প্রথমে করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন ওই ৬ ব্যক্তিই শত শত লোকে মাঝে করোনা ভাইরাস ছড়িয়েছে। এছাড়াও তিনি বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের লোকজন রোগীদের নমুনা সংগ্রহ করার পদ্ধতি ও রোগী বাছাই যথাযথ করার কারনে নমুনা পরীক্ষার ফলাফল অন্যান্য উপজেলার চেয়ে বেশী হচ্ছে।

বেগমগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: মাহাবুব আলম বলেন, চৌমুহনীর কাঁচা বাজার গুলো চৌমুহনী মদন মোহন উচ্চ বিদ্যালয় ও বেগমগঞ্জ সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে স্থানান্তর করা হয়েছে। এখানে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে কেনাবেচা করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

নোয়াখালী করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ কমিটির সদস্য সচিব ও সিভিল সার্জন ডা: মো: মোমিনুর রহমান বলেন, নোয়াখালীতে বেগমগঞ্জ উপজেলা হচ্ছে অতি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। গত ২৪ঘন্টায় এখানে আক্রান্তের সংখ্যা অস্বাভাবিক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এটা খুবই চিন্তার বিষয়। পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য বিভাগের লোকজন এ নিয়ে রাত দিন কাজ করে যাচ্ছেন।

প্রসঙ্গত, শুক্রবার পর্যন্ত জেলায় করোনা ভাইরাসের রোগীর সংখ্যা ৯৭ জন। যার মধ্যে জেলার বেগমগঞ্জে ৫১জন, সদরে ১৬জন, সোনাইমুড়ীতে ১১জন, হাতিয়ায় ৫জন, সেনবাগে ১জন, কবিরহাটে ৬জন, চাটখিলে ৫জন, কোম্পানীগঞ্জ ১ ও সুবর্ণচর উপজেলায় ১জন রয়েছেন। এদের মধ্যে মারা গেছেন সোনাইমুড়ীতে মোরশেদ আলম (৪৫) নামে এক ইতালি প্রবাসী, সেনবাগে এক রাজমেস্ত্রী মো. আক্কাস (৪৮) ও বেগমগঞ্জে তারেক হোসেন (৩০) নামের এক ব্যবসায়ী।

 

Sharing is caring!